Wed. Jan 22nd, 2020

Diganta

News. Opinion. Entertainment

চাপাতি হাতে লেখকের ছবিটি ফেক, লাঠি হাতের জয়েরটি প্রমাণিত

ফেসুবকে দুটি ছবি ভাইরাল হয়েছে। দেখুন প্রথম স্ক্রিনশটটি।

ভাইরাল হওয়া ছবি দুটি দুই সংঘর্ষের ঘটনার। তার একটিতে এক তরুণকে দেশিয় অস্ত্র হাতে দেখা যাচ্ছে। অন্যটিতে আরেক তরুণকে লাঠি হাতে দেখা যাচ্ছে।

দেশিয় অস্ত্র হাতে থাকা তরুণটিকে দাবি করা হচ্ছে তিনি ছাত্রলীগের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য। আর অন্য ছবিতে লাঠি হাতে থাকা তরুণটির পরিচয় বলা হচ্ছে তিনি ছাত্রলীগের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক আল নাহিয়ান খান জয়।

বহু মানুষের রিয়েকশন পাওয়া এবং শেয়ার হওয়া এরকম একটি ফেসবুক পোস্টের (সাথে ছবি দুটি যুক্ত) বক্তব্য তুলে ধরছি–

“এই দুইজন খুনি ছাত্রলীগের সেক্রেটারী – সভাপতি ভট্টাচার্য আর নাহিয়ান | গেস্ট রুমে নাকি ভালো কিছু শিখানো হয় | দুইটার হাতে কি আছে তা দেখলেই বুঝা যাই এরা একেকটা খুনি | খুনের মদদদাতা |”

আমাদের বেশ কয়েকজন পাঠক এই ছবিগুলোর সত্যতা জানতে চেয়েছেন।

আমরা খুঁজতে গিয়ে দুটি ছবিই অনলাইনে পেয়েছি।

যেই ছবিটিতে দেশিয় অস্ত্র হাতে এক যুবককে ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য বলে দাবি করা হচ্ছে সেটি ২০১৫ সালের ২ নভেম্বররে চট্টগ্রামের একটি ঘটনার ছবি (দেখুন পোস্টের ২য় স্ক্রিনশট)। চট্টগ্রামের কেন্দ্রীয় রেলওয়ে ভবন এলাকায় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের একটি সংঘর্ষের সময় এই ছবি তোলা হয়। এ নিয়ে তখনকার সংবাদমাধ্যমে সচিত্র প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছে। দেখুন ডেইলি সান-এর একটি সচিত্র প্রতিবেদন এই লিংকে: https://www.daily-sun.com/home/printnews/87793

এদিকে লেখক ভট্টাচার্যের বাড়ি যশোরের মনিরামপুরে। তিনি পড়াশোনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। চট্টগ্রামের একটি স্থানীয় সংঘর্ষে তার অংশ নেয়ার কথা নয়। আর পত্রিকার ছবিতে আরও ভালোভাবে অস্ত্রহাতে তরুণটির চেহারা দেখা যাচ্ছে। তাতে স্পষ্ট তিনি লেখক ভট্টাচার্য নন।

দ্বিতীয় যে ছবিতে লাঠি হাতে থাকা তরুণটিকে ছাত্রলীগের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক নাহিয়ান খান জয় বলে দাবি করা হচ্ছে সেই ছবিটি ২০১৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর রাজধানীর বকশীবাজার এলাকায় একটি সংঘর্ষের ঘটনার।

এই সংঘর্ষটি হয়েছিল মূলত ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের মধ্যে। বিএনপির নেত্রী খালেদা জিয়ার আদালতে হাজিরা উপলক্ষে বকশীবাজার এলাকায় গেলে সংঘর্ষটি বাঁধে।

বিডিনিউজ এই ঘটনার একাধিক ছবি প্রকাশ করেছিল তখন। বর্তমানে ফেসবুকে ছড়ানো ছবিটিও বিডিনিউজ’-এরই ফটোগ্রাফারের তোলা। ছবিটি বিডিনিউজের ওয়েবসাইটে দেখুন এই লিংকে: https://bdnews24.com/media-en/2014/…/24/clash-in-bakshibazar

(পোস্টের ৩য় স্ক্রিনশটে ছবিটি ক্যাপশনসহ দেখুন)

এই ছবির ক্যাপশনে বিডিনিউজ লিখেছে, “Clash breaks out between BNP supporters and government supporters at Dhaka’s Bakshibazar on Wednesday ahead of party chief Khaleda Zia’s arrival at court to attend hearing on graft cases.”

ছবিতে তরুণটির চেহারা অতটুকু স্পষ্ট নয় যে, শুধু ছবি দেখে নিশ্চিত হওয়া যাবে তিনি নাহিয়ান খান জয় কিনা।

যেহেতু নাহিয়ান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং বকশীবাজার এলাকাটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালের পার্শ্ববর্তী, এবং ওই সংঘর্ষটি হয়েছে ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের মধ্যে, তাই আমরা অনলাইনে খোঁজে দেখার চেষ্টা করেছি যে, ওই সংঘর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের কোনো সংশ্লিষ্টতার খবর পাওয়া যায় কিনা।

খুঁজতে গিয়ে শীর্ষ সব সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনেই দেখা গেছে সংঘর্ষটি মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সাথেই হয়েছে ছাত্রদল নেতাকর্মীদের।

২০১৪ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর প্রথম আলোতে ‘ছাত্রলীগ কোথায়?’ শিরোনামে সাংবাদিক সোহরাব হাসান একটি মন্তব্য প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। তাতে তিনি প্রশ্ন তোলেন, বকশীবাজারের সংঘর্ষের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় পুলিশ কেন শুধু বিএনপি ও ছাত্রদল নেতাকর্মীদের আসামি করে মামলা করলো; আসামিদের ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের নাম কোথায়?

মন্তব্য প্রতিবেদনটির এক জায়গায় সোহরাব হাসান প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে ছাপা হওয়া সংঘর্ষের বিভিন্ন ছবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের যেসব নেতাদের চেহারা দেখা গেছে বা নাম এসেছে তাদের নামের একটি তালিকা তুলে ধরেছেন। সেই তালিকায় নাহিয়ান খান জয়ের নামও আছে। তিনি তখন জহুরুল হক হল শাখার সাধারণ সম্পাদক ছিলন।

প্রথম আলোর সেই লেখা থেকে দুটি প্যারা তুলে ধরা হচ্ছে–

“…সরকার আইনের শাসন চাইলে দলমত-নির্বিশেষে অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিত। কয়েক দিন আগে প্রধানমন্ত্রী এক ভিডিও কনফারেন্সে সে রকম নির্দেশই প্রশাসনকে দিয়েছিলেন। কিন্তু বকশীবাজারের ঘটনায় আমরা উল্টোটাই হতে দেখেছি। প্রশাসন বা সরকার এই মারামারির সঙ্গে ছাত্রলীগের সম্পৃক্ততা পায়নি।

তাহলে গতকাল প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার-এ যাদের ছবি ছাপা হলো, তারা কারা? আবদুল আজিজ ফয়েজের কথা আগেই বলেছি। আরও ছিলেন ছাত্রলীগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সহসভাপতি মুনির হোসেন, উপগণযোগাযোগ সম্পাদক শাহাবুদ্দীন চঞ্চল, জহুরুল হল শাখার সভাপতি রিফাত জামান, একুশে হল শাখার যুগ্ম সম্পাদক মনজুরুল হক শুভ, জহুরুল হক হল শাখার সাধারণ সম্পাদক নাহিয়ান খান জয়, কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি জয়দেব নন্দী, বুয়েটের তিতুমীর হলের সাধারণ সম্পাদক আবু সাইদ কনক, কেন্দ্রীয় কমিটির সমাজকল্যাণ সম্পাদক কাজী এনায়েত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার যুগ্ম সম্পাদক এইচ এম আল আমিন, এস এম হলের সাধারণ সম্পাদক নিজামুল হক দিদার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক ওমর শরীফ। হয়তো আরও অনেকে ছিলেন, যাঁদের নাম পত্রিকায় ছাপা হয়নি।” (পোস্টের সর্বশেষ স্ক্রিনশট দেখুন)।

https://bit.ly/2My5Jvl

বকশীবাজারের সংঘর্ষে নাহিয়ানের অংশ নেয়ার বিষয়টি মিডিয়ার রিপোর্টের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া গেলেও উপরিউক্ত ছবির লাঠিওয়ালা তরুণটি নাহিয়ান কিনা তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

]বকশীবাজারের সংঘর্ষের ভাইরাল হওয়া ছবিতে লাঠি হাতে দৃশ্যমান তরুণটি যে নাহিয়ান খান জয় তার প্রমাণ মিলেছে ছাত্রলীগেরই এক নেতার কয়েক মাস আগে পোস্ট করা একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসে। এ বিষয়ে আমরা নতুন পোস্ট করেছি পেইজে। দেখুন আমাদের সর্বশেষ পোস্টটি।

 

https://www.facebook.com/bdfactcheck/