Mon. Feb 24th, 2020

Diganta

News. Opinion. Entertainment

সিফাত শিবিরের নয়, হাতে ধরা ছুড়িটি ফানি ভিডিও থেকে নেওয়া

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোতাহার হোসেন প্রিন্স বুধবার দিবাগত রাত (২৬ ডিসেম্বর, ২০১৯) ১২টা ৩০ মিনিটে তার ফেসবুক আইডিতে একটি পোস্ট করেছেন। “মুখোশ উন্মোচন” শিরোনামের পোস্টটিতে ৫টি ছবি যুক্ত করা হয়েছে। তার পোস্টটি হুবহু এখানে তুলে ধরা হলো–

//
“মুখোশ উন্মোচনঃ

*এই হলো নুরুর চেলা সিফাত, ছাত্র শিবির, অর্থ সম্পাদক, নারায়নগঞ্জ জেলা শাখা। সংযুক্ত ছবি গুলো তে লক্ষ করুন, চাপাতি হাতে, দেশিয় অস্ত্র হাতে, ছুরি হাতে কেমন ভরভর পৌশাচিক আক্রমন চালাচ্ছে। একবার ভাবুন তো এই সন্ত্রাসীরা ক্ষমতা পেলে কি করতে পাড়ে?…

*তারপরও কি মনে হয় নুরু নিরপেক্ষ?? নুরু বিএনপি-জামাতের এজেন্ডা বাস্তবায়নে মাঠে নামছে, নুরুর আশেপাশে যারা থাকে এর ৯৯ শতাংশ সক্রিয় ছাত্র শিবির-ছাত্র দলের কর্মী।

এদের সকল কে রুখে দারান,
জনসাধারণ কে সচেতন করুন”
//

পোস্টটির লিংক: https://www.facebook.com/prince307du/posts/2727418714004038

আর্কাইভ লিংক: http://archive.is/ETfPV

প্রিন্সের পোস্টের রেফারেন্সে কয়েকটি সংবাদমাধ্যম প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

BD FactCheck প্রিন্সের পোস্টের টেক্সট ও ছবিতে উল্লেখ করা ৩টি দাবি যাচাই করার চেষ্টা করেছে। ফলাফল হিসেবে যা পাওয়া গেছে তা তুলে ধরা হলো–

দাবি ১:

পোস্টের টেক্সটে (এবং প্রথম ছবিতে) প্রথম দাবিটি করা হয়েছে– “সিফাত, ছাত্র শিবির, অর্থ সম্পাদক, নারায়নগঞ্জ জেলা শাখা”

ছাত্রশিবিরের জেলা কমিটিগুলোর তথ্য তাদের ওয়েবসাইটে দেয়া নেই। নারায়ণগঞ্জ শিবিরের কমিটি নিয়ে অনলাইনে কোনো তথ্য আছে কিনা খুঁজে দেখতে গুগলে “ছাত্রশিবির অর্থ সম্পাদক নারায়ণগঞ্জ”– এই কীওয়ার্ডগুলো সার্চ করে দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকার একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়।

২০১৯ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত প্রতিবেদনটির শিরোনাম “নারায়ণগঞ্জে শিবিরের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত”। এই প্রতিবেদনে জেলা কমিটির কয়েকজন নেতার নাম রয়েছে। তাতে অর্থ সম্পাদক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে মোঃ সাব্বির নামে একজনকে।

সংগ্রামের প্রতিবেদনের লিংক: www.dailysangram.com/…/364436-নারায়ণগঞ্জে-শিবিরের-প্রতিষ্ঠা…

এরপর নারায়ণগঞ্জের একাধিক সাংবাদিকের মাধ্যমে শিবিরের জেলা কমিটির নেতাদের কাছে পৌঁছার চেষ্টা করা হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সাংবাদিক– যিনি স্থানীয় শিবির নেতাদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করেন– BD FactCheck-কে জানান, নারায়ণগঞ্জ ছাত্রশিবিরের জেলা শাখার বর্তমান অর্থ সম্পাদক হলেন মেসবাহ উদ্দিন নাসির। এবং মহানগর শাখার অর্থ সম্পাদকের নাম মুসলেহ উদ্দিন পাটোয়ারী।

তিনি আরও জানান, সংগ্রাম পত্রিকার প্রতিবেদনে ‘মো. নাসির’ নামে যার কথা উল্লেখ রয়েছে তিনি আগের কমিটির একই পদের নেতা ছিলেন।

অর্থাৎ, শিবিরের বর্তমান ও এর আগের কমিটির কোনো পদেই সালেহ উদ্দিন সিফাত নামে কেউ নেই, বা ছিলেন না।

এদিকে সালেহ উদ্দিন সিফাতকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি জানান, তিনি নারায়ণগঞ্জের কেউ নন। তার বাড়ি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে।

সিফাতের ভাষায়, “আমার পড়াশোনা দশম শ্রেণী পর্যন্ত সীতাকুণ্ডে এবং উচ্চমাধ্যমিক ফেনীতে‍। ২০১৮ সালে ইন্টার পাশ করে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হই ২০১৯ এর জানুয়ারিতে‍। ঠিক সেইসময় আমি নারায়ণগঞ্জ আমার মামার বাসা থেকে যাতায়াত করি‍। চাইলে ঢাকা ভার্সিটি থেকে নারায়ণগঞ্জে যাওয়া “আনন্দ” বাসের শিক্ষার্থীদের কাছে জিজ্ঞেস করতে পারেন‍।”

তিনি বলেন, “এর বাইরে নারায়ণগঞ্জের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। শিবিরের সাথে সম্পর্ক তো দূরের কথা।”

দাবি ২ ও ৩:

সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মোতাহার হোসেন প্রিন্সের পোস্টের ২য়, ৩য় ও ৪র্থ ছবিগুলো ইঙ্গিত করে লিখেছেন, “…(সিফাত) চাপাতি হাতে, দেশিয় অস্ত্র হাতে, ছুরি হাতে কেমন ভরভর পৌশাচিক আক্রমন চালাচ্ছে।”

প্রকৃতপক্ষে, ২য় ও ৩য় ছবি দুটি অনলাইনে ছড়ানো একটি ভিডিও থেকে নেয়া। অরিজিনাল ভিডিওটি ২০১৯ সালের ১৯ মে তারিখে জুনায়েদ চৌধুরী নামে একজনের ফেসবুকে আপলোড করা হয়। জুনায়েদ সিফাতের বন্ধু।

ভিডিও লিংক: https://m.facebook.com/story.php…

আর্কাইভ লিংক: http://archive.is/sG69l

ভিডিওটির ক্যাপশনে জুনায়েদ লিখেছেন–

//
“ভাইটি নব্য বদরুল হতে চেয়েছিল😂
কিন্তু চৌধুরী সাহেবকে হুমকি দেওয়ার পরক্ষণেই নিজ অস্ত্র আপন শরীরে আঘাত করে।(যদিও কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি)😍🙂
এইভাবে কালে কালে যত বদরুল আসবে, সবাই স্বীয় অস্ত্রে বিনাশ হইবে….🚫
বি.দ্রঃ ইহা শুধুই বিনোদন, অতিরিক্ত বুঝতে গিয়ে মস্তিকে এসিডিটি সমস্যা হইলে, কতৃপক্ষ দায়ী নয়😂😂”

//

৫১ সেকেন্ডের ভিডিওটিতে দেখা যাচ্ছে, সিফাত একটি বড় ছুরি হাতে নিয়ে নানান অঙ্গভঙ্গি করছেন এবং বাংলা সিনেমার জনপ্রিয় কিছু ডায়ালগের মতো করে কিছু কথা বলছেন (যেমন– “চৌধুরী সাহেব, আপনার মেয়ে… আপনার ছেলেকে বলেছিলো…”)। সেসব ডায়ালগের সাথে তার অঙ্গভঙ্গি এবং অরিজিনাল ভিডিওর ক্যাপশন মেলালে সেটিকে একটি ‘ফান ভিডিও’ বলেই প্রতীয়মান হয়।

সিফাত এ বিষয়ে BD FactCheck-কে বলেছেন, “আমরা গত রমজান মাসে বন্ধুরা মিলে ইফতারি বানাতে গিয়ে শসা কাটার সময় একটু ফান করেছিলাম। আমার বন্ধু জুনায়েদ চৌধুরী সেটা ভিডিও করে এবং মজা করেই সেটি ফেসবুকে পোস্ট করেছিলো। ভিডিওর ডায়ালগগুলো শুনলেই বুঝবেন এটা স্রেফ ফানি ভিডিও।”

ভিডিওতে শসা কাটার তো কোনো দৃশ্য নেই- BD FactCheck এর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে সিফাত আমাদেরকে ওই দিনের একই ঘটনার সময় তোলা একটি ছবি পাঠান। তাতে দেখা যায়, সেই একই ছুরি দিয়ে তিনি শসা কাটছেন।

৪র্থ ছবিটিতে দেখা যাচ্ছে, একটি মারামারির দৃশ্যে কোনো একজন লোককে মারধর করছেন কয়েকজন ব্যক্তি। তাদের মধ্যে সালেহ উদ্দিন সিফাত ও ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক আখতার হোসেনকেও দেখা যাচ্ছে। সিফাত তার ডান হাতে কোনো একটি বস্তু নিয়ে মাটিতে পড়ে থাকা একজনের ওপর মারমুখী হয়েছেন।

প্রিন্সের পোস্টে যুক্ত করা ছবিটির রেজুলেশন কম হওয়ায় সিফাতের হাতে থাকা বস্তুটি আদৌ কী তা স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে না।

BD FactCheck এই ছবিটির অনলাইনে থাকা অরিজিনাল ভার্সনটি পেয়েছে প্রথম আলোর ওয়েবসাইটে। অপেক্ষাকৃত ভাল রেজুলেশনের ছবিটিতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সিফাতের হাতের বস্তুটি একটি কালো রঙের কলম।

প্রথম আলোর ওয়েসবাইটে ছবিটির লিংক:

https://en.prothomalo.com/…/TOP-SHOTS-18-December-2019-imag…

১৭ ডিসেম্বর ছবিটি তুলেছেন প্রথম আলোর ফটোগ্রাফার Dipu Malakar. তিনি তার ছবির ক্যাপশনে লিখেছেন–

“Members of Dhaka University Central Students Union (DUCSU) and Mukijuddha Mancha in a scuffle following the former`s demonstration against the Citizenship Amendment Act (CAA) of India on Dhaka University campus in the Bangladesh capital on 17 December 2019. Activists of the Mukijuddha Mancha attacked the DUCSU vice president Nurul Haq, convener of the programme, and his associates first triggering the retaliation.”

অর্থাৎ, ডাকসু ভিপি নুরুল হকের ওপর মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের হামলার পর পাল্টা জবাব দিয়েছেন নুরুল হকের সহযোগী শিক্ষার্থীরা।

ওই দিন হাতে কী ছিলো- এমন প্রশ্নের জবাবে সিফাত জানান, ওটা কোনো ছুরি বা অস্ত্র নয়। ওটা আসলে একটি মার্কার পেন। তিনি বলেন, “ওই দিনের ডাকসুর কর্মসূচি অনুযায়ী পোস্টার লেখায় ব্যস্ত ছিলাম আমরা কয়েকজন। আমিও তাদের মধ্যে ছিলাম। এ কারণে আমার কাছে ওই মার্কারটি ছিল।

বিডি ফ্যাক্ট চেক
https://www.facebook.com/bdfactcheck/